সৌদি আরবের জাতীয় দিবস যেভাবে তৈরি হলো আজকের সৌদিআরব Bangla Khobor

এইচ.এম.ফরিদুল আলম আশরাফী
আন্তর্জাতিক রিপোর্টার

২৩ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের জাতীয় দিবস।
১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে বাদশাহ আবদুল আজিজ অধিকৃত সব অঞ্চলকে নিয়ে তাঁর সৌদ গোষ্ঠীর নামকরণে সৌদের আরব তথা সৌদি আরব নাম রাখেন এবং রাজতন্ত্র ঘোষণা করেন।

২২ লাখ ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল দেশ আজকের সৌদি আরব। পবিত্র মক্কা ও মদিনার কারণে আমাদের কাছে সৌদি আরবের রয়েছে আলাদা গুরুত্ব। পশ্চিমাঞ্চল হেজাজ, পূর্বাঞ্চল নজদ বড় দুই অঞ্চল। আল-কাসিম, আল-পাশা, খাইল, হাসা ইত্যাদি ছোট অঞ্চল নিয়ে আজকের বিশাল সৌদি আরব। মক্কা ও মদিনা কেন্দ্রিক অঞ্চলের প্রাচীন নাম হেজাজ। ১৯৬০-এর দশকেও আমাদের দেশে হেজাজ নামের প্রচলন ছিল।

বাদশাহ আবদুল আজিজ ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে কুয়েত থেকে এসে রিয়াদ দখল করেন। নজদের কেন্দ্রস্থল রিয়াদ। এখানে আবদুল আজিজের পূর্বপুরুষরা শাসনক্ষমতায় ছিলেন। তুর্কি সালতানাতের সহযোগিতা ও হস্তক্ষেপে আল রশিদ রিয়াদ দখল করেছিলেন। এতে বাদশাহ আবদুল আজিজের পূর্বপুরুষরা কাতার, বাহরাইন হয়ে কুয়েতে এসে বসবাস করতে থাকেন।

সে সময় থেকে দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর তিনি শক্ত হাতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশাল দেশকে শাসন করে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। এতে স্বাভাবিক নিয়মে প্রথম পুত্র হিসেবে সৌদ বাদশাহ হন। কিন্তু তিনি বারবার অযোগ্যতার প্রমাণ রাখতে থাকায় ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ফয়সাল বাদশাহর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি সৌদি আরবের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের পক্ষে নেতৃত্বের ভূমিকা রেখে গেছেন।

তিনি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ভ্রাতুষ্পুত্রের গুলিতে নিহত হন। বাদশাহ ফয়সাল নিহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সত্ভাই বাদশাহ খালেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন নরম ও শান্ত প্রকৃতির। বাদশাহ খালেদ মাত্র সাত বছর দেশ শাসন করে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে হৃদেরাগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন।

তাঁর আমলে সৌদি আরবের অগ্রগতির সূচনা বলা যাবে। যেমন—জেদ্দা, মদিনা বিমানবন্দর নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করা, মক্কা-মদিনা মহাসড়ক নির্মাণসহ সারা সৌদি আরবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ নানা উন্নয়ন হয়।

তাঁর ইন্তেকালের পর যুবরাজ ফাহাদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাদশাহ হন। তাঁর আমল সৌদি আরবে নানা দিক দিয়ে স্বর্ণযুগ। বিশেষ করে হজ, ওমরাহ, জিয়ারতকারীদের কল্যাণে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বাদশাহ ফাহাদ জীবনের শেষ দিকে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে যুবরাজ আবদুল্লাহ বাদশাহর দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ফাহাদ ইন্তেকাল করলে আবদুল্লাহ পুরোপুরি বাদশাহ হন। বাদশাহ আবদুল্লাহর রয়েছে দীর্ঘ ৯০ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন।

তিনি মায়ের দিক দিয়ে বাদশাহ আবদুল আজিজের একমাত্র পুত্র। তাঁর আমলেই বাদশাহ ফাহাদের সহোদর ছোট ভাই সুলতান ও নায়েফ যুবরাজ থাকা অবস্থায় পর পর ইন্তেকাল করেন। তিনিও বাদশাহ ফাহাদের মতো খাদেমুল হারামাইনিস শরিফাইন উপাধি ধারণ করেছিলেন।

২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জানুয়ারি বাদশাহ আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করলে সৌদি রাজপরিবারে প্রভাবশালী সুদাইরি পরিবারের কন্যার কনিষ্ঠ ও সপ্তম পুত্র বর্তমান বাদশাহ সালমান বাদশাহি পদ লাভ করেন। বাদশাহ সালমানের আমলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইয়েমেনের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

৮৫ বছরের বৃদ্ধ বর্তমান বাদশাহ সালমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে নানা ঝামেলায় আছেন। শিয়া অধ্যুষিত ইরানের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাওয়া, শিয়া ঠেকাতে প্রতিবেশী ইয়েমেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, সম্প্রতি প্রতিবেশী রাজতন্ত্রীয় দেশ কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা, যুক্তরাষ্ট্র কাতারের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে দ্বৈতনীতি পরিলক্ষিত হওয়াসহ নানা প্রতিকূলতায় বৃদ্ধ বয়সে বাদশাহ সালমানকে টেনশনে রাখছে। তবে পিতার পক্ষে যাবতীয় পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে তাঁরই পুত্র যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান।

পবিত্র মক্কা ও মদিনার কারণে বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্ব সৌদি আরবকে সম্মানের চোখে দেখে। বাংলাদেশ কামনা করে, সৌদি আরবে সুন্দর পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে সৌদি আরবে কোটির কাছাকাছি বাংলাদেশি নর-নারী নানা পেশায় কর্মরত।

বিশাল সৌদি আরবের এমন কোনো অফিস-আদালত, দোকানপাট, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ঘরবাড়ি নেই যেখানে এক বা একাধিক বাংলাদেশি কর্মরত নেই। শুধু তা-ই নয়, প্রতিবছর লাখের ওপর নর-নারী হজ করতে সৌদি আরব গমন করছে, আরো গমন করছে লাখের কাছাকাছি ওমরাহর যাত্রী। স্বভাবতই বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখতে চাইবে।